দুরন্ত শৈশব
আমি গ্রামের ছেলে, গ্রামেই বড় হয়েছি । গ্রামের স্কুলে আমার অনেক বন্ধু ছিল । সময়ের
স্রোতে ভেসে এক এক করে সবাই কিভাবে যেন আস্তে আস্তে করে দূরে সরে গেল । কেউ অভাবের
তাড়নায়, কেউ বা গ্রাম বদলের কারনে ঝরে পড়ল । আমার এখনও
মনে পড়ে, আমার এক চাচা ছিল যার ক্লাশ রোল সবসময় ৪ হত,
কমতোও না বাড়তও না । কতদিন সেই চাচাকে দেখিনা । কিছুদিন আগে
আম্মুর কাছে শুনলাম তিনি সৌদি আরব এ আছেন ।
স্কুলের অনেক ঘটনা আছে মনে পড়লে এখনো হাঁসি পায় J । আমাদের
স্কুলে প্রতি বৃহস্পতি বারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত । সপ্তাহের বাকি দিনগুলো শান্ত
শিষ্ট থাকলেও এই একটা দিনে আমাদের বাঁদরামি যেন বেড়ে যেত । এক বৃহস্পতিবারে
আমাদের প্রধান শিক্ষক বৃক্ষরোপণে উৎসাহ প্রদান করে লম্বা একটা
বক্তৃতা দিলেন এবং পরেরদিন গাছ লাগানোর কর্মসূচি ঘোষণা করলেন । তারপর আমাদের একে
একে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলেন আমাদের বাড়ির আশেপাশে কোনো গাছ আছে কিনা যেটা তুলে
এনে স্কুল মাঠে লাগানো যাবে । আমার পালা আসলে আমি বললাম “ স্যার, আমার বাড়ির পাশে একটা বরই গাছ আছে”,
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “কতবড় ???” আমি
তখন আমার ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথা তর্জনীর গোড়ায় নিয়ে আঙ্গুল তুলে দেখালাম
আর বললাম “স্যার এতবড় ।” এরকিছুক্ষন পর আবিস্কার করলাম আমার পিঠে লম্বা লম্বা
লাঠির দাগ, আমার চোখে পানি আর স্যার এর মুখে কথা “ আমার
সাথে ফাইযলামি ??????????” আর কখনো ফাইযলামি করার দুঃসাহস
করিনি । তারপর থেকে এমন সোজা হলাম যে সেই প্রধান শিক্ষকের প্রিয় ছাত্রে পরিনত
হয়েছিলাম । স্যার আমাকে খুব ভালবাসতেন । আমার আব্বুর দোকানের সামনে বসে আমাকে
প্রানভরে আশীর্বাদ করেছিলেন যেদিন তিনি চাকরি থেকে অবসর নিলেন । তখন বুঝিনি পরে
যখন স্যারকে স্কুলে পেতামনা আর একটু বুঝতে শিখলাম তখন স্যার কে খুব মনে পড়ত ।
স্যার, যেখানে থাকবেন ভাল থাকেন আর আমার জন্য দোয়া করবেন
সেদিনের মত ।
সপ্নের মত চোখে ভাসে সেই দিনগুলো । রবি ঠাকুরের একটা গান মনে
পড়ে যায় “ দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়, রইলনা রইলনা সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলো......” । আর এক বৃহস্পতিবারে আমদের সবার কাছ থেকে জানতে
চাওয়া হয়েছিল কে কি খেতে পছন্দ করি । আমার তখন আলুর প্রতি আলাদা আকর্ষণ ছিল (
কেন জানিনা) , আমি যথারীতি
দাঁড়িয়ে বললাম “আলু” , সারা ক্লাসে হাঁসির রোল পড়ে গেল
। তারপরের দিন ছুটি, শনিবারে ক্লাস শেষ হবার পর শুরু হল
আসল ঘটনা । আমার এক চাচাত বোন পড়ত আমাদের সাথে, তার
নেতৃত্তে সবাই আমাকে “আলুখেকো আলুখেকো আলুখেকো ” বলে খেপাতে লাগলো । প্রথম দিন
কিছু না বলে চলে আসলাম । দ্বিতীয় দিনেও স্কুল ছুটি হবার পর একি ঘটনা । সেদিনও
সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করলাম । কিন্তু তৃতীয় দিনে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রন করতে
পারলামনা, দৌড়ে গিয়ে আমার সেই চাচাত বোনের হাত ধরে
দিলাম একটা কামড় (রাগের মাথায়) , হাতের মাংস সহ চামড়া
কেটে রক্তপাত করে বাসায় ফিরলাম । আর এর প্রতিদানে আব্বুর বেতের লাঠি রাতের বেলা
আমার পিঠ আর পেছন দিকের সাথে মোলাকাত করল । পরবর্তী এক সপ্তাহ স্কুলে যাইনি ।
তারপর থেকে সেই চাচাত বোন আমার সাথে কথা বলতনা । তাঁর এই মান ভাঙতে ৫ বছর লেগে
যায় । যখন ৮ম শ্রেণীতে উঠলাম তখন কি এক প্রয়োজনে কথা বলা শুরু করে আবার । এখন
স্বামী সংসার নিয়ে অনেক সুখে আছে ।
সেই স্মৃতি বিজড়িত আমার গ্রামের প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে একদিন
আমার মেজ মামার হাত ধরে চললাম নানির বাড়ি। কারন ওইগ্রামে একটা ভাল স্কুল আসে
যেখানে ভাল শিক্ষাদান করা হয়। অগত্য কি আর করা ???????? L বিরস বদনে মামার
বাইসাইকেল এর পেছনে চড়ে ছেড়ে গেলাম আমার প্রিয় ঘর, বাড়ি, গ্রাম,
খেলনা গুলো (তখনো আমার ছোট ভাইটা পৃথিবীর আলো দেখেনি তাই রবি
ঠাকুরের “ছুটি” গল্পের মত হস্তান্তর করে যেতে পারিনি ) সেই সাইকেলের পেছনে বসে ফ্ল্যাশ ব্যাক এর মত সব স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল ।
সেই আনন্দের দিন, বাঁধন হারা পাখির মত ছুটে বেড়ানো সেই
দিন গুলো পিছু ডাকছিলো কিন্তু কিছুই করার ছিল না।
একটু আগে বলছিলাম স্কুলের ঘটনা আর এখন বলব স্কুলের বাইরের ঘটনা ।
আমরা যারা গ্রামে বেড়ে উঠেছি আমদের
সবার জীবনে অনেক মজার ঘটনা আসে যেগুলো আজকে হয়ত বড়দের কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে
কিন্তু আমরা তখন সীমাহীন আনন্দ পেতাম । যেমন – বর্ষাকালে বৃষ্টি পড়া শুরু হলে
আমাদের ঘরে আঁটকে রাখে কার সাধ্য ????? দৌড় দিতাম মাঠ বরাবর, উদ্দেশ্য একটাই – মাঠে
জমা হওয়া হাটু পানিতে ইচ্ছেমত দাপাদাপি করা আর শখের যে ফুটবল টা আছে তাকে ইচ্ছা মত লাথি দেয়া । আমি একা না, কিছুক্ষনের মাঝেই জুটে যেত আমার সাঙ্গপাঙ্গরা । বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত
কাদামাটিতে হুটোপুটি করে শেষে ফুটবলটা হাতে নিয়ে দুরুদুরু বুকে ফিরতাম বাড়ি । বাসায় আসা মাত্রই আমার দাদু তাঁর ট্রেডমার্ক গালি (খারাপ কোন গালি নয়
কিন্তু) দিয়ে বলতেন “ ঊড়বং টা আইসছে, শামসুন (আমার মা এর নাম) এক লিয়া যায়া আরেকদফা পুখরে (পুকুর) এ
চুবায়া লিয়া আইসো তো !!!!” আম্মু
এসে আমাকে নিয়ে গিয়ে সাবান দিয়ে ডলে ডলে গোসল করিয়ে দিতেন । শধু ভয় পেতাম
আব্বুকে । এমনও হয়েছে আমি বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছি এর মাঝেই আব্বু বাসায় চলে
এসেছে , দাদু মারফত খবর পেয়ে বৃষ্টি
থামার পরও ২-৩ ঘন্টা বাসায় ঢুকিনি । এই ভয়ে যদি আব্বু মারে L
আব্বুর ‘মার’ কে আমি আসলেই অনেক ভয়
করতাম, আমাদের বাসায়
একটা বেতের লাঠি ছিল । অনেকদিন আমার পিঠ এর সাথে সেই লাঠির মোলাকাত হয়েছে । আম্মু
আমাকে বাঁচাতে আসার সাহস পেতেন না । আমাকে আব্বুর কাছে থেকে নিয়ে যেতেন আমার বুবু (দাদি) , আপনারা
হয়ত আমার আব্বুকে ভীষন রাগি ভাবছেন, পাষন্ড ভাবছেন ।
ভাবলে ভুল ভাবছেন । কারন আমার আব্বু হল নারকেল এর মত । যখন একটু বড় হলাম তখন
বুঝলাম । এও বুঝলাম, পৃথিবীর সব আব্বুরাই এমন J ।
আব্বুকে যে আমি যমের মত ভয় পেতাম । আর
তাঁকে ভয় পেয়ে কি করতাম তার আরেকটা উদাহরন দিচ্ছি । আমদের বাসায় ধান মাড়াই করা
মেশিন ছিল যেটা পা দিয়ে চালাতে হত । আপনারা দেখেছেন কিনা জানিনা সেই মেশিনে দুইটা
দাঁত ওয়ালা চাকা ছিল। আমি একদিন সেখানে খেলছিলাম । হঠাত মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চাপল, মেশিন চালাতে লাগলাম। বাসার সবাই তখন
ঘরে গল্প করছিল । হঠাত ছোট চাকাতে কি যেন দেখে তা সরাতে গেলাম, চাকা ঘুরছিল, আস্তে করে আমার বাম হাতের
শাহাদাত আঙ্গুল চলে গেল দুই চাকার মাঝে । ফলাফল যা হবার তাই হল, আঙ্গুল এর মাথা থেঁতলে গেল । আব্বু বকা দেবে এই ভয়ে কাওকে না বলে বাসা
থেকে বের হয়ে গেলাম । এদিকে রক্ত পড়ছে বিরামহিন। কিছুক্ষন পর যন্ত্রনা শুরু হল ।
আমি তখন হাত ঘুরাতে লাগলাম লম্বালম্বি ভাবে (বোকার মত কাজ ছিল ) , কিছুটা আরাম পাচ্ছিলাম । গিয়ে উঠলাম এক চাচার বাসায়, চাচা আমার হাতের অবস্থা দেখে প্রায় কোলে করে নিয়ে বাসায় দিয়ে
গিয়েছিল । পরে অবশ্য আব্বু কিছু বলেননি । বুঝতে পেরেছিলেন বোধহয় যে তার ভয়েই
আমি এই কাজটি করেছিলাম ।
অনেকেই হয়ত বিরক্ত হচ্ছেন আমার এই
লেখা পড়ে কিন্তু আমি একথা ১০০% নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারি যে বাল্যকালের
স্মৃতিচারন করতে সবারই ভাল লাগে। তা হোক না সে যতই ক্ষুদ্র । আমার ছোটবেলায় একটা T শার্ট পরতাম । কেন জানি আজো মনে আছে
সেই শার্ট এর বুকে কি লেখা ছিল । “ I love my country ” এই
লাইন টা লেখা ছিল । সেই যে বুকে ধারন করেছি লাইন টা আজো লালন করে যাচ্ছি । দোয়া
করবেন যেন আমৃত্যূ পর্যন্ত যেন পারি ।
একবার মার্বেল খেলতে গিয়ে ৪০ টা
মার্বেল জিতে এসেছিলাম ( আমি ছিলাম গ্রামের সবচেয়ে খারাপ খেলোয়াড়, কেন জানিনা, সেদিন সবকটি দান আমি জিতছিলাম ), সেকি আনন্দ
!!! সেইদিন ছিল শুক্রবার, আমার জন্য ঈদের দিনের মত ছিল।
এছাড়াও আর কিছু দিন ছিল যেগুলো আমার কাছে
ঈদ এর দিন এর মত মনে হত। আমি ছোটবেলায় (এখনো) তরমুজ খেতে খুব ভালবাসতাম এবং অনেক
খেতেও পারতাম। যেদিন আব্বু বাজার থেকে তরমুজ,
বাদাম, গাজর, ঝুরি,
পিয়াজু ইত্যাদি আনতো সেদিন আমাকে আর পায় কে !!!! আব্বু বাজার
থেকে এসে ব্যাগ বারান্দায় রেখে ঘরে ঢোকা মাত্রই আমার কাজ ছিল ব্যাগ খুঁজে খাবার
জিনিস বের করা। পরেরটুকু আন্দাজ করতে মনে হয় অসুবিধা হবেনা আপনাদের।
মামার সাইকেলের পেছনে বসে বসে এইগুলোই
চিন্তা করছিলাম। আর কি হবে মার্বেল খেলা ? আর কি হবে বৃষ্টির পানিতে দাপাদাপি ? আর কি
হবে আব্বুর বাজার এর ব্যাগ খোঁজা ???????? কিন্তু এটা
ভেবে আনন্দ হচ্ছিল যে আব্বুর বকা আর মাইর খাইতে হবেনা কিন্তু তখন বুঝিনি কোন পরিবেশে যাচ্ছি । মা নেই, দাদু নেই , আব্বু নেই – এ যেন
সবাই আছে কিন্তু কেউ নেই ধরনের অবস্থা।
যাই হোক মামার বাড়ি গিয়ে পরেরদিন গেলাম নতুন স্কুলে । নতুন
বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন শিক্ষক - সবকিছু নতুন । প্রথম
দিনেই আমার সাক্ষাৎকার
নেয়ার জন্য হেড মাস্টার এর ঘরে ডাক
পড়ল । নাহ ভয় পাইনি কারন আমি যখন আমার গ্রামের স্কুল এ ভর্তি হই তখনকার একটা
ঘটনা আছে। প্রাইমারি স্কুলের শ্রেণীগুলোর ধারাবাহিক ক্রম গুলো বলে নেই আগে । ছোট
ওয়ান ( নার্সারি – যেখানে বর্নমালার সাথে পরিচয় করানো হয় ) > বড় ওয়ান ( প্রথম শ্রেনী - যেখানে কিছু
বাক্য গঠন আর নামতা/যোগ-বিয়োগ শেখানো হয় ) > দ্বিতীয়
শ্রেনী > তৃতীয় শ্রেনী > চতুর্থ
শ্রেনী > পঞ্চম শ্রেনী । তো আমি ছোট ওয়ান এ প্রথমে
ভর্তি হলাম । বছর শেষে সমাপনি পরিক্ষায় ভাল নাম্বার সহ পাশ করলাম । এই ফলাফল দেখে
আমার আব্বু আমাকে সরাসরি ২য় শ্রেনীতে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন । আব্বুর এই
আবেদন শুনে আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক
আমার সাক্ষাৎকার নিতে চাইলেন । আমি গেলাম, তিনি যা
যা প্রশ্ন করলেন ঠিক ঠিক উত্তর দিলাম। তিনি খুশি হয়ে আমাকে ২য় শ্রেনীতে ভর্তি
করার অনুমতি দিলেন ।
আসলে ছোটবেলার সব ঘটনা মনে থাকেনা
কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা থাকে যেগুলো চোখের সামনে ছবির মত ভাসতে থাকে । এটাও এমনি ।
আর তাছাড়া আমার শিক্ষার শুরু আমার বাসায় হয়েছিল । সন্ধায় আম্মু নিয়ে পড়াতে
বসতেন আর একটু রাত হলে আব্বু বাসায় এসে দায়িত্ব নিতেন পড়ানোর । একদিন একটা
কবিতা লিখছিলাম “ হাসতে নাকি জানেনা কেউ, কে বলেছে ভাই ?” হঠাত আম্মু খেতে ডাকলো । লেখা
রেখে খেতে গেলাম এসে দেখি আব্বু হাসছেন। জিজ্ঞেস করতেই আমার খাতা আমার চোখের সামনে
মেলে ধরলেন, আমি পড়লাম “ হাসতে নাকি জানেনা কেউ, কে বলেছে ভাই ? এই শোনোনা কত হাসির খবর বলে
যাই, খোকন হা ” ( ‘হা’ এর পরেরটুকু না লিখেই খেতে চলে
গিয়েছিলাম), জানিনা এতে হাসার কি ছিলো কিন্তু অনেক
হেসেছিলাম সেদিন।
যাই হোক ফিরে আসি আসল ঘটনায়। নতুন
স্কুলের হেড মাস্টার আমাকে কিছু প্রশ্ন করে সঠিক জবাব পেয়ে খুশি হলেন। নতুন ক্লাশ
, নতুন বন্ধু । আমি আর
আমার ছোট খালা একই সাথে পড়তাম । আমি নতুন দেখে তার এক বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে
দিল, যে পরে আমার খুব ভাল বন্ধু হয়েছিলো । নাম ছিল
আমিনুল, আমরা একসাথে স্কুলে যেতাম একসাথে আসতাম । প্রতিদিন সকালে ওর বাসায়
গিয়ে ওকে নিয়ে একসাথে যেতাম । একবার রাস্তায় কিছু ফুলের গাছ পেলাম । নিয়ে
গিয়ে দুজন মিলে স্কুলের সামনে লাগিয়েছিলাম। কিছুদিনের মধ্যে সেই চারা গাছ বড়
হয়ে ফুল ফুটলো , দেখলাম
অইটা ছিল মোরগ ফুলের গাছ । ২-৩ মৌসুমেই পুরা স্কুল আঙ্গিনা ভরে গেল গাছে । আমাদের
এই কাজ দেখে আমাদের স্কুলের হেড মাস্টার একটা বাগান করার পরিকল্পনা করলেন। আর তা
প্রতিযোগিতার মাধ্যমে করলেন । প্রত্যেকটা শ্রেনীর জন্য আলাদা আলাদা যায়গা
নির্ধারন করে দিলেন। বাগান প্রতিযোগিতা, মুলতঃ সেখান
থেকেই বাগান করা আমার শখ হয়ে দাঁড়ায় । কিন্তু সেই শখটা সেই প্রাইমারি পর্যন্তই
ছিল । এর পরে আর কোনো কিছু শখ হিসেবে বেড়ে উঠেনি । যাই হোক, সেই বাগান প্রতিযোগিতায় আমাদের ক্লাসটাই বিজয়ী হয়েছিল। স্কুলের
সময়টুকু সবসময় উপভোগ করতাম।
শুধু সমস্যা হত বাসায় আসলে । আমার
মেজ মামা আমাদের ৩ জনকে ( আমি, ছোট খালা আর ছোট মামা ) এত কড়া শাসনে রাখতেন যে জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল । আগে পড়তাম আনন্দের সাথে, যখন নিজের বাসায় ছিলাম। চাচাত ভাইদের বই
নিয়ে একা একাই পড়তাম, ভালো লাগত । কিন্তু মামার বাসায়
গিয়ে পড়ার প্রতি এমন একটা ধারনা এসে গিয়েছিল যে পড়ার কথা শুনলেই মনটা খারাপ
হয়ে যেত । মুলতঃ লেখাপড়ার প্রতি অনিহা সেখান থেকেই সৃষ্টি । যতটুকু পড়তাম তা
মামার ভয়ে পড়তাম । রেজাল্ট ভালো হত কিন্তু মনটা খারাপ থাকত।
আব্বু প্রতি সপ্তাহে একবার আসতেন নানির
বাড়ি । কতদিন যে চিঠি লিখেছি আব্বুকে দেব বলে , কিন্তু ভয়ে দিতে পারিনি । কি লিখতাম জানেন ??? লিখতাম – আব্বু , আমি এখানে থাকবনা, আমাকে নিয়ে যান। এখানে ভাল লাগেনা .................. এইসব ।
কেন লিখতাম তার দুই-একটা উদাহরন দেই।
গ্রামের বাচ্চারা গরমের সময় পানিতে দাপাদাপি করতে খুব পছন্দ করে, আমিও এর ব্যাতিক্রম না । একদিন গোসলে
গিয়ে একটু লম্বা সময় নিয়েছিলাম । মামি, নানি, খালা অনেকে অনেকবার বলেছে আমি উঠিনি পুকুর থেকে। সাথে আমার সমবয়সি
কয়েকটা মামা ছিল । তখন মেজ মামা এলেন । এসে আমার সাথের মামাদের ডেকে পানি থেকে
তুলে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন আর নিজে বসে রইলেন পুকুর পাড়ে, যেন আমি না উঠতে পারি । পাক্কা দুই ঘন্টা পানিতে আমি একা একা । ভীষন
ভয় পেয়েছিলাম ।
আরেকদিন ঘরের ভেতর আমি আর আমার ছোট
খালা পড়ছিলাম, মামা তখন
বাইরে ছিল । পড়তে পড়তে এক সময় আমি পড়া বাদ দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে
বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম । এমন সময় মামার আগমন ঘটল । আমাকে ওই অবস্থায় দেখে ওই
অবস্থায়ই থাকতে বললেন । থাকলাম ১ ঘন্টা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে । মামা আমাকে
কখোনো মারেননি কিন্তু কেন জানি ভয় পেতাম ।
তারপরেও সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তাম ।
কোনদিন আম বাগানে আম চুরি করা, তো কোনদিন বড়মামার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া । কোনদিন মামাত ভাইদের
সাথে মার্বেল খেলা , তো কোনদিন তাদের সাথে মাঠে গিয়ে ধান
কুড়ানো ( কুড়ানো ধান দিয়ে আইস্ক্রিম খাওয়ার জন্য ) ।
যাই হোক শেষ পর্যন্ত পার করলাম মামার
বাসার দেড় বছর। তারপর ফিরে আসলাম চিরচেনা আপন রাজত্বে । আমার গ্রামে । নতুন স্কুল (উচ্চ মাধ্যমিক) , নতুন
বন্ধু, নতুন বই, নতুন শিক্ষক
মজাই আলাদা । আর সবচেয়ে বেশি আনন্দের সংবাদ ছিল মামার হাত থেকে মুক্তি মিলেছে
শুরু
করলাম নতুন জীবন ।
প্রাইমারি পাশ করেছি, এখন ক্লাশ সিক্সে , রুখবে আমায় কে ????? ইয়াহু উ উ উ উ
হাই স্কুলের প্রথম দিনেই প্রথম ক্লাশ
ছিল বাংলা ব্যকরন, শিক্ষক
ছিলেন আমার গ্রামের এক চাচা । শুরুতেই সবার পরিচয় নিলেন । সেখানে পেলাম নতুন কিছু
বন্ধু যাদের আগে কখনো দেখিনি । পাশের গ্রাম থেকে এসেছিল । আর পেয়েছিলাম ‘বনি
ইস্রাইল’ নামের এক শিক্ষক কে । যাঁর ভয়ে আমরা সবাই তটস্থ থাকতাম । স্কুলের ত্রাস
নামে পরিচিত ছিলেন । আমরা আর কারো পড়া করে যাই কি না যাই সেই স্যার এর পড়া মিস
হতনা। কিন্তু যথারীতি ক্লাশে গিয়ে স্যার যখন জিজ্ঞেস করতেন বেমালুম ভুলে বসতাম ।
ফলাফল স্যারের হাতের লাঠির সম্পুর্ন প্রয়োগ ।
আমি বরাবর অঙ্কে কাঁচা ছিলাম । আব্বু
এক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ানোর ব্যাবস্থা করলেন । প্রতিদিন সকালে স্কুলে গিয়ে
প্রাইভেট পড়তাম এক ঘন্টা তারপর স্কুলের এ্যাসেম্বলিতে জয়েন করতাম । একদিন আমি
একটু আগে গেলাম, গিয়ে
দেখি স্কুলের বারান্দায় একটা মৌমাছির চাক । দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় চাপলো। হাতের
কলম আস্তে আস্তে করে ঢুকিয়ে দিলাম চাকের ভেতর । দেখলাম মৌমাছিগুলো আস্তে আস্তে
সরে যাচ্ছে । মজা পেয়ে গেলাম । পরেরদিন কলম না দিয়ে আঙ্গুল দিলাম এগিয়ে ।
দেখলাম আগের মতই সবাই সরে যাচ্ছে । দেখে আরো মজা পেলাম । এর পর প্রতিদিন একই কাজ
করতাম। ৩-৪ দিন এমন করার পর একদিন সকালে গিয়ে যেই আঙ্গুল দিয়েছি সাথে সাথে ৫টা
মৌমাছি একযোগে হুল ফুটিয়ে দিল , L সেকি ব্যথারে ভাই ।
সেদিন একটা ক্লাশ টেস্ট ছিল দিতে চাইনি লিখতে পারবোনা বলে। এখন তো বলতে হবে কি
জন্যে লিখতে পারবোনা । সেটাও বলা যাবেনা কারন লজ্জার কথা । হুল খেয়েছি শুনলে
ক্লাশের মেয়েরা হাঁসবে । তাই মিথ্যা কথা বললাম ‘পড়ে আসিনি’ সাথে সাথে শাস্তিও
পেয়ে গেলাম । আগের মতই, আমার
পশ্চাতদেশের সাথে স্যারের হাতের বেতের মোলাকাত , কি আর
করা স্কুল শেষে দুই যায়গায় ব্যাথা নিয়ে বাসায় ফিরলাম তারপর থেকে মৌমাছি দেখলেই সাবধান হয়ে যাই।
আরেকদিন আমাদের গ্রামের এক রাস্তার
পাশে একটা বোলতার চাক দেখতে পেলো গ্রামের বান্দর পোলাপাইন গুলা । আর সেদিন পাশের
গ্রামের এক দুর্ভাগা লোক অই রাস্তা ধরে যাচ্ছিল । তার কিছুক্ষন আগেই অই বান্দরগুলা
বোলতার চাকে ঢিল মেরে চাক গরম করে রেখেছিল । তো সেই লোক সেই চাকের কাছে পৌছা মাত্র
আর যায় কোথায় , ঝাঁকে
ঝাঁকে বোলতা এসে হুল ফুটাতে লাগল । বেচারার চিৎকার শুনে
আমার বড়চাচা আর গ্রামের কিছুলোক দৌড় দিয়ে গিয়ে বস্তা পেঁচিয়ে উদ্ধার করে আনলো
। সেই বেচারার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খালি প্রলাপ বকছিল “বেয়াই
ডাক্তার আনো টাকা দিব, ডাক্তার
আনো টাকা দিব” যাই হোক পাশের গ্রাম থেকে ডাক্তার এনে তাকে সেবা-শশ্রুষা করে ভালো
করে পাঠানো হল। অনেকদিন অই লোকের সাথে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল । পরে যখন নিজের
দেশের বাড়ি চলে গেল তখন আর যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি (মোবাইল ছিলনা তাই সম্ভবত)।
আমাদের গ্রামের বাড়িটা মাটির তৈরি ছিল
। অনেকদিন আগের তৈরি ছিল তাই দেয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল । একদিন আমি আবিস্কার
করলাম সেই ফাটলে একদল বোলতা বাসা বেঁধেছে । আমার আগের সেই ঘটনা মনে পড়লো, ভাবলাম আর কেউ যাতে দুর্ঘটনার শিকার
না হয় তাই কাদা দিয়ে সেই ফাটল বন্ধের অভিযানে নামলাম । আমার পিছু পিছু আমার ছোট
ভাই আসলো দেখতে আমার কর্মকান্ড । আমি অনেক নিষেধ করা সত্বেও সে আমার পিছু ছাড়লোনা
। তো আমি প্রথম কাদার গোলা ছুঁড়লাম যায়গা মত গেলনা । দ্বিতীয় গোলা ছুঁড়লাম
গর্তটার অর্ধেক বন্ধ হল বাকি অর্ধেক দিয়ে ভুর ভুর করে সব বোলতা বেরিয়ে এল । আমি
তো দৌড়ে পালালাম কিন্তু বেচারি আমার ছোটভাই ধরা পড়ে গেল । পুচ্চিটা ঠিকমত দৌড়াতে
পারেনি । ফলাফল ৪ টা হুল খেয়ে গেল । বাসায় ফিরে আম্মুর মাইর খাইলাম কেন ওকে
নিয়ে গেছি বলে । আর আমার জন্য বেচারা ভাইটা
হুল খেল চিন্তা করে অনুতপ্ত হলাম । তাই মৌমাছির মত বোলতার পেছনে লাগাও ছেড়ে দিলাম
সেদিন থেকে।
আমি রাতে যে ঘরে ঘুমাতাম সে ঘরের দুইটা
দরজা ছিল । আসলে সেটা ছিল গেস্ট রুম ধরনের । বাইরের কেউ আসলে সেই ঘরে বসতে দেয়া
হত। সেই বাইরের দরজার সু্যোগে কত্তকিছু যে করেছি !!!
আমদের বাসায় যে কাজের ছেলে ছিল তার
নাম ছিল ম্যানুয়েল মার্ডি (আমরা ডাকতাম ‘মানি’ বলে) আর সে ছিল সাঁওতাল । আমার
সমবয়সি হওয়াতে আমার সকল প্রকার দুষ্টুমিতে সাথে পেয়েছি । কারো গাছের আম চুরি
করা, তাল কুড়ানো,
শীতের রাতে খেজুরের রস চুরি করা ইত্যাদি ইত্যাদি ।
তাল কুড়ানো নিয়ে একটা কাহিনি আছে। আমরা মাঝে
মাঝে তাল কুড়ানোর জন্য পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে অন্যরাও আসতো
কিন্তু তারা বসে থাকত একটু দূরে । একদিন ইচ্ছা হলো মজা করব । যেই ভাবা সেই কাজ ।
মানির হাতে দিলাম ঢিল আর আমি নিলাম মাটির বড় দলা । পকুর পাড়ে গিয়ে মানি তাল
গাছের পাতায় ঢিল মারল তাতে সড়াত করে আওয়াজ হলো । আর আমি কিছুক্ষন পরে মাটির
দলাটা পুকুরে ফেলে দিলাম তাতে ঝপাত করে আওয়াজ হলো। সবাই ভাবলো তাল পড়েছে, সবাই দৌড়ে আসল। আমাদের আর হাসি থামায় কে ?
এভাবেই হেঁসে খেলে পার করেছি ছোটবেলা, এখন দিন দিন বড় হচ্ছি আর মনে পড়ছে সেই
সব দিনের কথা। ভাবছি বড় কেন হলাম ?? ছট ছিলাম ভালোই ছিলাম। কোন দায়িত্ব নেই, কোন
দুঃশ্চিন্তা নেই, খালি দুস্টুমি করে বেড়ানো। মাঝে মাঝে তাই খুব মনে পড়ে ছোটবেলার
কথা। কেন যে বড় হলাম ????
বিঃদ্রঃ এটাকে খন্ড খন্ড আকারে সামুতে(সামহোয়্যার ইন ব্লগ) প্রকাশ করেছিলাম। আজকে সংকলন করে এখানে দিলাম । (www.somewhereinblog.net/shams7600)